তারিখ : ৩০ মে ২০২০, শনিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

যে বন বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে বাংলাদেশ

যে বন বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে বাংলাদেশ
[ভালুকা ডট কম : ২৩ মে]
পৃথিবীর ইতিহাসে উপকূলীয় অঞ্চলে যতসব ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় তাণ্ডব চালিয়েছে , তার বেশিরভাগই বঙ্গোপসাগরে হয়েছে। বিশ্বের সবচাইতে প্রলয়ঙ্করী মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের ৩৫ টির মধ্যে বঙ্গোপসাগরেই হয়েছে প্রায় ২৬ টি (তথ্যঃ ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড)। এখন ২৭ তম ঘূর্ণিঝড় হিসেবে তালিকাভুক্ত হলো ঘূর্ণিঝড়  আম্পান। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় তটরেখায় প্রায় ৫০ কোটি লোকের বসবাস। এসবের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় তটরেখায় বাংলাদেশের সুন্দরবনের বিস্তৃতি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে উপকূলীয় এলাকা এবং বাংলাদেশকে রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করছে সুন্দরবন। দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের জন্য এটি রক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক পেতে দিয়ে কোটি মানুষের জান মালের রক্ষা করে থাকে সুন্দরবন ।

সুন্দরবনকে বলা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। লবনাক্ত ও কর্দমাক্ত ভেজা মাটির এ বনকে বাংলাদেশের ফুসফুস বলা হয়। সুন্দরবনের বড় অংশ পটুয়াখালী জেলার দক্ষিণ পশ্চিম অংশ থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমে বৃহত্তর খুলনা পাড় হয়ে পশ্চিমবঙ্গের কাছে রায়মঙ্গল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার, যা সম্পূর্ণ বনের ৬২ শতাংশ। বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার অংশবিশেষ নিয়ে এটি বিস্তৃত।  

সুন্দরবনের কম লবনাক্ত অঞ্চলে গোলপাতা, হিতাল, সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, আমুর ও গরান উদ্ভিদ জন্মে থাকে। অধিক লবনাক্ত অঞ্চলে কাঁকড়া, বাইন, পশুর, ধুন্দল প্রভৃতি জন্মে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২০০ সে. মি. এবং প্রাণিকূলে প্রজাতির সংখ্যা স্থলে ২৮৯ ও জলে প্রায় ২১৯ টি। এদের মধ্যে প্রধান আকর্ষন রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এতে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে শত শত নদী, খাল ও বিল জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। সুন্দরী গাছের আধিক্যের কারনে এর নাম সুন্দরবন। এতে তিনটি বন্যজীব অভয়ারণ্য নিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা গঠিত। ১৯৯২ সালে এটি ‘রামসার সাইট’ হিসেবে এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে একে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা করে।

জাতীয় অর্থনীতিতে এবং দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের  জনজীবনে সুন্দরবনের ভূমিকা অতুলনীয়। বাংলাদেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস এটি। এছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমের আলোকে জানা যায় যে, এটি দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশ, বন থেকে আসা মোট আয়ের ৪১ শতাংশ এবং কাঠ ও জ্বালানি উৎপাদনে প্রায় ৪৫ শতাংশ অবদান রাখে। এর অপরুপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবছর দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের সমাগম হয়। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়েছিল যে, এই বন প্রচুর উৎপাদন মূলক ও প্রতিরোধ মূলক ভূমিকা পালন করে থাকে।

দুর্যোগের সময় তীব্র গতির বাতাস এবং জলোচ্ছ্বাস এ দুই ধরনের ধাক্কা সামলাতে হয় এ বনকে। বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় বন পার হয়ে লোকালয়ে যেতে যেতে শক্তি হারিয়ে দমকা বাতাসে পরিবর্তিত হয়ে যায়। সুন্দরবনে বাধা পেয়ে লোকালয়ে পৌছানোর আগেই জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের উচ্চতা অনেকটা কমে যায়। এসব কারণে লোকালয়ের ক্ষয় ক্ষতির আশঙ্কা হ্রাস পায় বলে মনে করেন পরিবেশবিদগণ। সুন্দরবন মূলত শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ বহু নিদর্শন উল্লেখ আছে।

প্রতিঘন্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর কেঁড়ে নিয়েছিল প্রায় ৩,৫০০ মানুষের প্রাণ। হাজার হাজার পশু সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল। বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। সুন্দরবনের বিশাল ক্ষতি হয়েছিল। সুন্দরবন না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ হাজার গুণে বেড়ে যেতো। ২৫ মে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ তার সম্পূর্ণ শক্তি দেখাতে ব্যার্থ হয়েছিল শুধুমাত্র সুন্দরবনের জন্য। একইভাবে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ কে তান্ডব চালাতে বাধা দিয়েছিল। বুক পেতে ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।

বঙ্গোপসাগর হয়ে আসা ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই আমাদের মনে আশা জাগে যে, এবারো সুন্দরবন মায়ের মতো আগলে রাখবে প্রিয় বাংলাদেশকে।  এবারের সুপার সাইক্লোন আম্পানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভয়ংকরী তান্ডবের প্রায় পূরোটা সুন্দরবনের উপর দিয়েই গেছে। এক্ষেত্রে যতটা ক্ষতির আশঙ্কা ছিলো তা কমাতে সুন্দরবন শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। তবে আম্পান মোকাবিলায় সুন্দরবনকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ৪৬ জেলার ৭৬ হাজর হেক্টরের বেশি জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্লাবিত জমিতে লবণাক্ত পানির কারণে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।গণমাধ্যমের আলোকে জানা যায় যে, সুন্দরবন আম্পানের গতিকে ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটারের মত কমিয়েছে, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কমিয়েছে ৩ থেকে ৪ ফুট।    

কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় হলো বনদস্যুদের অপতৎপরতা, প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকের অভাব, নির্বিচারে বন উজাড় করা, বনজসম্পদ রক্ষা বিষয়ক জ্ঞানের অভাব, বাঘ হত্যা ও হরিণ শিকার ও স্থানীয় লোভী ব্যক্তিদের কারণে এ বন আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। এছাড়াও সুন্দরবন ধ্বংসে বিভিন্ন অপকর্ম থেমে নেই। বিপন্ন হওয়ার পথে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে না পারলে পূরো দক্ষিনাঞ্চল একটা দ্বীপে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞগণ।

২২ মে, বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসের ঠিক আগেই সুন্দরবন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো তার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। গত এক যুগ ধরে জাতিসংঘের  পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি সহ অন্যান্য সংস্থাগুলো বলে আসছে যে, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সুন্দরবন তথা ম্যানগ্রোভ বনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের  জীববৈচিত্র্যের একক আধার হলো সুন্দরবন। এটিই একমাত্র রক্ষাকবচ তথা গ্রেট ফাইটার।

সুতরাং এখনি সময় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গৃহীত আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সুন্দরবনসহ সমগ্র বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। এ লক্ষে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।পরিশেষে বলা যায় সুন্দরবন বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে সভ্যতা, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বাংলাদেশের।

লেখক,বার্তা প্রেরক
জাহাঙ্গীর আলম তরফদার
প্রভাষক, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ
সরকারি এম এম আলী কলেজ, টাঙ্গাইল।





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

পরিবেশ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১২৬০ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই